ব্ল্যাক হোল (কৃষ্ণ বিবর) – পর্ব ২

0

গত পর্বে আমরা কৃষ্ণ বিহ্বর বা ব্ল্যাক হোলের (Black Hole) কিছু বেসিক বিষয় জেনেছিলাম। এবার আমরা ভেতরের দিকে প্রবেশ করব এবং অনেক গাণিতিক আলোচনার সাথে পরিচিত হব। যারা প্রথম পর্ব পড়েন নি, তাদের জন্য প্রথম পর্ব পড়ে আসা বাধ্যতামূলক। প্রথম পর্বের লিংক নীচে দিয়ে দিচ্ছি
পড়ুন: ব্ল্যাক হোল (কৃষ্ণ বিবর) – পর্ব ১

তো শুরু করা যাক!

ব্ল্যাক হোলের জন্ম

ব্ল্যাক হোলের জন্ম হয় আসলে মৃত নক্ষত্র বা সোজা বাংলায় নলে মৃত তারা থেকে। ছোটবেলায় শুনতেন না, মানুষ মরে গেলে ভূত হয়ে যায়? তো, তারার ভূত হল ব্ল্যাক হোল 😜 (আশা করি এখন মনে থাকবে সহজেই)।

সাধারণত, যখন বড় বড় নক্ষত্রের জ্বালানি শেষ হয়ে যায়, তখন তারা মহাকর্ষের মাধ্যমে নিজেরাই নিজেদেরকে ধ্বংস করে ব্ল্যাক হোল সৃষ্টি করে।

এবার ব্ল্যাক হল সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ টার্ম জেনে নিই। যেগুলো না জানলেই নয়।

ঘটনা দিগন্ত বা ইভেন্ট হরাইজন (Event Horizon)

ঘটনা দিগন্ত নামটির দিগন্ত শব্দটি থেকেও এর বর্ননা আন্দাজ করা যায়। কোন কিছু ব্ল্যাক হোলের যে সীমানায় গেলে আর ফিরে আসতে পারে না, তাকেই ঘটনা দিগন্ত বলে। এটাকে ‘প্রত্যাবর্তনের শেষ বিন্দু’ বলা হয়। কেননা এই সীমা অতিক্রম করলেই তা হারিয়ে যাবে ব্ল্যাক হোলের গহ্বরে।

এই ঘটনা দিগন্তকে ব্ল্যাক হোলের আকার হিসেবে ধরা হয়। কেননা এখান থেকেই ব্ল্যাক হোলের মূল ক্ষমতার শুরু হয়।

সংকট ব্যাসার্ধ বা সোয়ার্জস্কাইল্ড ব্যাসার্ধ (Schwarzschild Radius)

কথা হল, অনেক কিছুই বুঝলাম। এখন একটা ব্ল্যাক হোল হতে হলে তাকে কি কি বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে হবে?

আসলে ব্ল্যাক হোল হতে হলে একটি বিশাল ভরের বস্তুর আকার একদম ক্ষুদ্র করে আনতে হবে ব্যাসার্ধ কমিয়ে। তাহলে যেকোনো কিছুকেই ব্ল্যাক হোলে পরিণত করা যাবে। কেননা ক্ষুদ্র জায়গায় বিপুল পরিমাণ বড় সঞ্চিয় থাকার কারণে এর মহাকর্ষীয় আকর্ষণ এতটাই তীব্র হবে যে আলোও বেরুতে পারবে না। তাই কোন বস্তুর ভর যদি একটি নির্দিষ্ট সংকট ব্যাসার্ধের সমান বা কম হয়, তখনই এটি ব্ল্যাক হোলে পরিণত হবে। এই সংকট ব্যাসার্ধ নির্ণয়ের সমীকরণ হল,

Rₛ = 2GM/c²

এই সমীকরণে বস্তুর ভর M বসালেই সংকট ব্যাসার্ধ পাওয়া যাবে। যদি পৃথিবীর জন্য দেয়া বের করি, তবে শুরুতেই বলে নিই, পৃথিবীর ব্যাসার্ধ হল, ৬৩৭১০০০ মিটার। তাহলে পৃথিবীর সংকট ব্যাসার্ধ হবে ০.০০৮৯ মিটার বা ০.৮৯ সেন্টিমিটার! মানে এত বড় পৃথিবীকে চেপে যদি মোটামুটি ১ সেন্টিমিটার ব্যাসার্ধের বানাতে পারি, তাহলেই পৃথিবী ব্ল্যাক হোল হয়ে যাবে 😉

যাইহোক, এই অসাধারণ সমীকরণ ধারণা নিয়ে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্ব থেকে নিয়ে আসেন বিজ্ঞানী কার্ল সোয়ার্জস্কাইল্ড। তাই ওনার নামানুসারে এটাকে সোয়ার্জস্কাইল্ড ব্যাসার্ধও বলে।

হকিং বিকিরণ বা হকিং রেডিয়েশন (Hawking Radiation)

ব্ল্যাক হোল থেকে কি কিছুই বেরোয় না? আসলে একসময়ে ধারণা করা হতো ব্ল্যাক হোল থেকে কিছুই বেরোয় না। তবে পরবর্তীতে ধারণা করা হচ্ছে ব্ল্যাক হোল থেকেও কিছু বেরোয়। এই তত্ত্বীয় বিকিরণের ধারণার প্রবক্তা বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং হওয়ায় এর নামকরণ করা হয়েছে হকিং রেডিয়েশন।

১৯৭৪ সালে স্টিফেন হকিং দেখিয়েছিলেন কিভাবে ব্ল্যাকহোলে কৃষ্ণবস্তুর মতো বিকিরণ হয়। এই পদ্ধতির সহজ ব্যাখ্যা হল, স্টিফেন হকিং অনুমান করেছিলেন ব্ল্যাকহোলের ঘটনা দিগন্তের কাছাকাছি শূন্যস্থানে শক্তির ফ্ল্যাকচুয়েশনের মাধ্যমে কণা-প্রতিকণা (Particle-Antiparticle) সৃষ্টি হয়। এর ভিতর একটি পদার্থ ব্ল্যাকহোলের ঘটনা দিগন্তে পড়ে যায় এবং অন্যটি ঘটনা দিগন্তে পড়ার আগেই বেরিয়ে আসে হকিং বিকিরণ হিসেবে। যার ফলে ব্ল্যাকহোল দেখা যায়। কারণ এখানে কণা বা পার্টিকল নির্গত হচ্ছে।

যেহেতু ঘটনা দিগন্ত থেকে মুক্তি পাওয়া পদার্থটির শক্তি বাইরের মহাবিশ্বের সাপেক্ষে ধনাত্মক সেহেতু ব্ল্যাকহোলে পতিত পদার্থটির শক্তি হবে বাইরের মহাবিশ্বের সাপেক্ষে ঋণাত্মক। যার ফলে ব্ল্যাকহোল ক্রমাগতভাবে শক্তি এবং ভর হারায়। কেননা ভর ও শক্তি একে অপরের রূপ মাত্র (E=mc² সূত্রানুযায়ী)।

ধারণা করা হয়, এভাবে ক্রমাগত বিকিরণের মাধ্যমে একসময় ব্ল্যাক হোল নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তবে হকিং বিকিরণ নিয়ে অনেক বিজ্ঞানী দ্বিমত পোষণ করেন।

ব্ল্যাক হোল ভ্রমণ

অনেক প্যাচাল হয়েছে। এখন চলুন, করোনা ভাইরাস উপলক্ষে প্রাপ্ত ছুটিতে ব্ল্যাক হোলে একটা ট্যুর মেরে আসি। 😜 ভয় নেই, ব্ল্যাক হোলে ভ্রমণ করতে ঘর থেকে বেরুতে হবে না। শুধু কল্পনা শক্তি কাজে লাগাবেন। তো শুরু করা যাক, মিশন ব্ল্যাক হোল!

ঘটনা দিগন্তে গিয়েই শুরুতে একটা লাফ দিবেন। তাহলেই ব্ল্যাক হোল আপনাকে আমন্ত্রণ করবে তার কাছে। পড়ন্ত বস্তুর কথা মনে আছে? বইয়ে নিশ্চয়ই পড়েছিলেন? পড়ন্ত বস্তু কিন্তু ওজনহীন হয়। আপনার তখন নিজেকে ওজনহীন মনে হবে। তবে এতে স্বস্তির কিছু নেই। একটু পর শুরু হবে আসল চমক।

আপনার পা যেহেতু মাথা থেকে নীচে থাকবে, সেহেতু পায়ে টান থাকবে অত্যাধিক বেশি। শুরুতে আপনি লম্বাটে হয়ে যাবেন। ধীরে ধীরে যত ভেতরে ঢুকবেন, টানের পরিমাণ তীব্র থেকে তীব্রতর হবে। আপনিও লম্বা হতে থাকবেন। লম্বা হতে হতে নুডলসের মত লম্বা হয়ে যাবে 😛। কিংবা তার আগেই টানের কারণে আপনার পা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে। আসলে শেষ মাথায় যাওয়া লাগবে না। তার আগেই আপনি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে কণায় পরিণত হয়ে যাবেন 😥।

তাই ভুলক্রমেও এখানে ভ্রমণ করার দরকার নেই। মাঝেমধ্যে কল্পনায়, ব্ল্যাক হোল রাজ্যে হারিয়ে যেতে পারেন 😉।

যাইহোক, আজ আর নয়। শেষ করছি দুই পর্বের ব্ল্যাক হোল বিষয়ক এ ক্ষুদ্র আর্টিকলদ্বয়। আসলে অনেক বিশাল অংশই বলার সুযোগ হয় নি। তার উপরে আমার জানার বাইরেও প্রচুর বিষয় আছে, যা বলা সম্ভব হয় নি।

একটি উত্তর লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
খানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে