ক্রিপ্টোকারেন্সি ও বিটকয়েন

0

এই টপিকটা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে লিখব লিখব বলে হচ্ছিলই না। অবশেষে লিখেই ফেললাম 😀

ওয়েল, বিটকয়েনের নাম তো শুনেছেন নিশ্চয়ই? আগে না শুনলেও অন্তত ডার্ক ওয়েবের আর্টিকলে শুনেছিলেন। এই বিটকয়েন হল এক প্রকারের ক্রিপ্টোকারেন্সি (Cryptocurrency)। তবে ক্রিপ্টোকারেন্সি বোঝার আগে ক্রিপ্টোগ্রাফি (Cryptography) সম্মন্ধে একটু জেনে আসা যাক। নাহলে মূল বিষয়টা ধরতে কষ্ট হবে খানিকটা।

ক্রিপ্টোগ্রাফি

“Tfou 3 njmmjpo svcmf.”

উপরের বাক্যটা বুঝতে পারছেন? অনেকেই হয়তো আমাকে পাগল ভাববেন, কিসব লিখছি। চিন্তার কিছু নেই। কিছুক্ষণ পরেই রহস্যের জট খুলে যাবে 😉 তো, মূল লেখায় প্রবেশ করি।

ক্রিপ্টোগ্রাফি হল তথ্যবিজ্ঞান বা ডেটা সায়েন্সের (Data Science) এক অসাধারণ বিষয়। অসাধারণ কেন বলছি? কারণ ক্রিপ্টোগ্রাফির নাম থেকেই বোঝা যাবে। ক্রিপ্টোগ্রাফি হল তথ্যগুপ্তিবিদ্যা। নাম থেকেই বুঝতে পারছি, তথ্য বা ডেটা লুকানোর বিদ্যাকেই ক্রিপ্টোগ্রাফি বলে। এখন নিশ্চয়ই কেন অসাধারণ সেটা আঁচ পেয়েছেন।

তথ্য লুকানো আসলেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটা গল্প শোনাই। রফিক সাহেব একটি ওয়েবসাইট বানাবে। যেখানে তার অফিসের সকল কর্মকর্তা লগিন করে সকল কাজ করবে। সেটার জন্য একটা ডেটাবেজ তৈরি করলেন। সেখানে ইউজার নেইম এবং পাসওয়ার্ড থাকবে। সমস্যা হল, ডেটাবেজে ঢুকতে পারলেই তো যে কেউ পাসওয়ার্ড পেয়ে যাবে। তাই তিনি একটা কাজ করলেন। পাসওয়ার্ডগুলো md5 hash ব্যবহার করে গুপ্ত করে দিলেন। ফলে পাসওয়ার্ড এখন দুর্বোধ্য হয়ে গেল এবং নিরাপত্তা রক্ষা হল।

এটা তো ছোট কাজ। বিশাল প্রজেক্ট যখন করবেন, তখন নিরাপত্তার কথা সবার আগে ভাবতে হবে। নাহলে সহজেই হ্যাক হয়ে যেতে পারে আপনার ডেটাবেজ (Database)। তখন মাথায় হাত দেয়া ছাড়া উপায় নেই।

[নোট: md5 এর কিছু ত্রুটি থাকায় একে বর্তমানে নন-ক্রিপ্টোগ্রাফিক কাজে ব্যবহার করা হয়। md5 ব্যতীত আরো অনেক হ্যাশিং সিস্টেম আছে।]

ক্রিপ্টোগ্রাফির কার্যক্রম

এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, ক্রিপ্টোগ্রাফি কিভাবে কাজ করে। শুধু বললাম, রফিক সাহেব তার তথ্য লুকিয়ে ফেললেন, তবে কি হবে নাকি? আচ্ছা, চলুন একটু ছোট ধারণা নিয়ে আসি। ধরুন আমেরিকানদের সাথে রাশানদের যুদ্ধ চলছে। এখন রাশানরা তাদের সৈনিককে হেড কোয়ার্টার থেকে কিছু গোপন তথ্য পাঠাবে। এখন যেকোনো সময় হামলা হয়ে রাশানরা আমেরিকানদের কাছে ধরা পড়ে যেতে পারে। তো, রাশান কমান্ডার একটা মেসেজ পেলেন:

“Tfou 3 njmmjpo svcmf.”

এই বাক্যটা নিশ্চয়ই চেনা চেনা লাগছে? শুরুতেই বলেছিলাম। এটার মূল মেসেজ হল:

“Sent 2 million ruble.”

কিন্তু কিভাবে? এবার একটু খেয়াল করুন ক্রিপ্টোগ্রাফিটা। এখানে প্রতিটা লেটারকে (Letter) তার পরের লেটার দ্বারা রিপ্লেস (Replace) করা হয়েছে। মূল মেসেজের S কে বানানো হয়েছে T, e কে f, n কে o এভাবেই বাকিগুলো। এখন যে বিষয়টা জানে না, সে ধরতে পারবে না। ফলে খুব সহজেই তথ্য গোপন রাখা যাচ্ছে। এরকমই একটা উপায় করা হয়েছিল, রফিক সাহেবের ক্ষেত্রে। যদিও হ্যাশিংয়ের বিষয়টা একটু আলাদা, তবুও মূল বিষয়টা বুঝতে পারবেন এক্ষেত্রে।

মূলত এই উদাহরণটাও খুব সাধারণ। সবাইই ধরতে পারবে। এখানে আপনাকে শুধু বিষয়টা সহজে বোঝার জন্য বলা হচ্ছে। আসলে আজকের মূল টপিক ক্রিপ্টোকারেন্সি হওয়ায়, ক্রিপ্টোগ্রাফি নিয়ে বিস্তারিত বলার সুযোগ নেই। ক্রিপ্টোগ্রাফি এবং এনক্রিপশন নিয়ে একটা বড় আর্টিকল পাবেন শীঘ্রই (ইন শা আল্লাহ)

ক্রিপ্টোকারেন্সি

এখন আশা করি এটা বুঝেছেন যে, ক্রিপ্টোকারেন্সি হল ক্রিপ্টোগ্রাফির মতই গুপ্ত। যেহেতু কারেন্সি শব্দ আছে, সেহেতু এটি মুদ্রার সাথে সম্পর্কিত। ঠিক ধরেছেন। ক্রিপ্টোকারেন্সি হল গুপ্ত মুদ্রা। মূলত এ ধরণের মুদ্রার কোন ভৌত রূপ নেই। সম্পূর্ণটাই মেশিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ফলে এটার নিরাপত্তা অত্যাধিক। এমনকি সরকারও এর উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি নিষিদ্ধ।

এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, নিরাপদ এবং গোপন। তাই কে কার সাথে লেনদেন করছে, তা কেউ জানতে পারবে না। যেটা কিনা ব্যাংকে সম্ভব না। তবে পৃথিবীর কোন কিছুই নিরাপদ না। ক্রিপ্টোকারেন্সি হ্যাকের ঘটনাও ঘটেছে। আবার ডার্ক ওয়েবও অনেকবার হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছে। তাই কোনকিছুকেই ১০০% নিরাপদ ভাবা বোকামি।

বর্তমানে জনপ্রিয় একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি হল বিটকয়েন (Bitcoin)। আরো কয়েকটি ক্রিপ্টোকারেন্সি হল:

১. ইথেরিয়াম
২. লাইটকয়েন
৩. রিপল
৪. মোনেরো
৫. ড্যাশ
৬. বাইটকয়েন
৭. ডোজকয়েন

ক্রিপ্টোকারেন্সির কার্যপদ্ধতি

ক্রিপ্টোকারেন্সি এমন এক প্রকারের গুপ্তমুদ্রা যা কিনা পিটুপি বা পিয়ার টু পিয়ার (P2P – Peer to Peer) ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রেরক থেকে সরাসরি প্রাপকের কাছে যায়। তাই স্বাভাবিকভাবেই এর বিনিময় পদ্ধতিও আলাদা। এবার চলুন বিস্তারিতভাবে কার্যপদ্ধতি আলোচনা করি। এটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল:

১. ওয়ালেট:

বাস্তব জীবনের ওয়ালেটের (Wallet) মতই এটি। তবে পার্থক্য হল এটি একটি কঠোর নিরাপত্তাযুক্ত ওয়ালেট। এটি অনলাইন ও অফলাইন উভয় ধরনেরই হতে পারে। এখানে আপনি আপনার টাকা রাখবেন। প্রয়োজনে এখান থেকে খরচ করবেন। আবার কেউ আপনাকে পাঠালে এই ওয়ালেটেই জমা থাকবে। প্রতিটি ওয়ালেটের এক একটি নির্দিষ্ট এনক্রিপ্টেড ঠিকানা থাকে। যেমনটা হয় আইপি এড্রেস (IP Address)। তবে এটা এনক্রিপ্টেড এবং অনন্য (Unique) হবে।

২. ব্লকচেইন:

ব্লকচেইন (Blockchain) এমন এক প্রক্রিয়া যা এক ঠিকানা থেকে অন্য ঠিকানায় অর্থ পাঠাতে তা এনক্রিপটেড লেজারে (Encrypted Ledger) নথিভুক্ত হয়ে যায়। উল্লেখ্য, এখানে জমা থাকা তথ্য পৃথিবী যে কোন স্থান থেকে দেখা যায়।

৩. মাইনিং:

সিস্টেম নাহয় তৈরি হল। এখন এতে নিরাপত্তার ব্যবস্থা আরো জোরদার করার প্রয়োজন। সেজন্যই এসেছে মাইনিং (Mining)। ব্লকচেইনে সব লেনদেনের বৈধতা নির্ণয়করণকে (Validity Checking) বলা হয় মাইনিং। আর এ কাজ যারা করেন তাদেরকে বলা হয় মাইনার। ফলে ঝুঁকিমুক্ত লেনদেন হয়।

বিটকয়েন

ক্রিপ্টোকারেন্সি জগতের সবচেয়ে জনপ্রিয় নাম, বিটকয়েন। বিটকয়েন (₿) বিশ্বের সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় মুক্ত-সোর্স ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং ডিজটাল মুদ্রা (Digital Currency)। এটি ১৮ই আগস্ট ২০০৮ সালে চালু হয়। bitcoin.org ডোমেইন নেইমের মাধ্যমে এটি যাত্রা শুরু করে। ২০০৮ সালের নভেম্বরে সাতোশি নাকামোতো রচনাকারে বিটকয়েন কি এবং কিভাবে কাজ করে তা প্রকাশ করেন metzdowd.com ওয়েবসাইটের মেইলিং লিস্টে।

২০০৯ সালে নাকামোতো বিটকয়েনের সোর্সকোড উন্মুক্ত করে সোর্সফর্জ (Sourceforge) নামে একটি ওয়েবসাইটে। একই মাসে বিটকয়েন নেটওয়ার্ক সম্প্রচার করা হয় এবং সাতোশি ব্লকচেইনের সর্বপ্রথম ব্লক মাইন করে যাকে ‘জেনেসিস ব্লক’ বলা হয়। তারপর থেকে আজ অবধি চলছে বিটকয়েন। মূলত অবৈধ লেনদেনের ক্ষেত্রে বিটকয়েন খুব জনপ্রিয়। ডার্ক ওয়েবে বিটকয়েন দিয়ে লেনদেনের ভালো সুযোগ আছে।

আজ এ পর্যন্তই। ধন্যবাদ পড়ার জন্য।

একটি উত্তর লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
খানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে