রহস্যময় ফিবোনাচ্চি ধারা

ক্লাস এইটে গণিতের প্যাটার্ন নামে একটা অধ্যায় ছিল মনে আছে? সেখানে একটা ধারা ছিল ফিবোনাচ্চি ধারা (Fibonacci Series) নামে। ধারাটি একটু লিখেই দেখায়,

১, ১, ২, ৩, ৫, ৮, ১৩, ২১, ৩৪, ৫৫, ৮৯, ১৪৪, …..

হ্যাঁ, এই চমৎকার ধারার নামই ফিবোনাচ্চি ধারা। চমৎকার বলছি, কারণ প্রকৃতি এই ধারাটি মেনে চলে। কি? অবাক হচ্ছেন? অবাক হওয়ার কিছু নেই। এগুলো নিয়ে আলোচনা করব। বলা হয়ে থাকে ফিবোনাচ্চি ধারা সৃষ্টির রহস্য ব্যাখ্যা করে। এই ধারা নিয়ে বোঝার আগে ধারা জিনিসটা কি সেটা একটু জেনে আসি।

ধারা

গণিতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ধারা। ধারা বলতে অসীম বা সসীম পরিমাণ রাশিকে যোগ করা বোঝায়। এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে, দুই ধরণের ধারা হতে পারে।

১. সসীম ধারা
২. অসীম ধারা

সসীম ধারা

যে ধারার সীমা আছে। অর্থাৎ যে ধারার শেষ আছে, সেটাই সসীম ধারা। সসীম শব্দের অর্থই এটা। এই ধারার যোগফল নির্ণয় করা সহজ। কেননা এটার একটা সীমা আছে। সেই সীমা পর্যন্ত যোগ করা সহজ হবে শুধু প্যাটার্ন নির্ণয় করতে পারলেই! উদাহরণ:

১+৬+১১+১৬+২১+২৬+৩১

অসীম ধারা

যে ধারার কোন সীমা নেই, তাকেই অসীম ধারা বলব। অসীম মানেই হল সীমাহীন। যার কোন শেষ নেই। টাইনেই ধারারও পদের শেষ নেই। এখানে একটা সমস্যা। আপনি যার শেষটাই জানেন না, তার সবগুলো পদকে যোগ করবেন কিভাবে? কিন্তু আসলে অসীম ধারাকেও যোগ করা যায় সহজেই। সেক্ষেত্রে কিছু শর্ত আছে। যাইহোক, সেদিকে আগালাম না। উদাহরণ দেখে আসি,

১+৬+১১+১৬+২১+২৬+৩১+…..+১১২১+…..+∞

এই গেল ধারার ধারণা। এবার আবার ফিরে আসি ফিবোনাচ্চি ধারায়।

ফিবোনাচ্চি ধারা

ত্রয়োদশ শতাব্দীর বিখ্যাত গণিতবিদ ‘লিওনার্দো দা পিসা‘ এই ধারাটি আবিষ্কার করেন। ওনার ডাকনাম ‘ফিবোনাচ্চি‘ থেকে এই ধারার নাম হয় ‘ফিবোনাচ্চি ধারা‘। ধারাটি বোঝার জন্য আবার দিচ্ছি:

১, ১, ২, ৩, ৫, ৮, ১৩, ২১, ৩৪, ৫৫, ৮৯, ১৪৪, …..

খেয়াল করুন, প্রতিটি পদের মান পূর্ববর্তী পদের সমষ্টি। যেমন ধরুন, ৬ষ্ঠ পদ ৮ হয়েছে পূর্ববর্তী দুই পদ অর্থাৎ ৪র্থ ও ৫ম পদের যোগফল ৩+৫ থেকে। একইভাবে ১০ম পদ ৫৫ হয়েছে ২১+৩৪ থেকে। এভাবে বাকিগুলোও হয়েছে।

কথা হল, এই ধারা নাহয় বুঝলাম। এটার কাজ কি? কি লাভ এই ধারা দিয়ে?

প্রকৃতিতে ফিবোনাচ্চি ধারা

গণিতবিদ ফিবোনাচ্চি ১২০৩ সালে খরগোশের প্রজননে সর্বপ্রথম এই ধারাটি লক্ষ্য করেন। ধরুন আপনার কাছে দু’টো খরগোশ আছে। এখন এদের প্রজনন হবে। এক্ষেত্রে যদি একটি খরগোশের বাচ্চাও যদি না মারা যায় এমন যে যদি দু’টি খরগোশ থেকে প্রজনন শুরু হয়, আর একটি খরগোশও না মারা যায়, তবে ১০ মাসে ৫৫ টা খরগোশ হবে এবং ১১ মাস পরে তা হবে ৮৯ টি, ১২ মাস পরে সংখ্যাটি দাঁড়াবে ১৪৪! এ বিষয়টি তখন দৃষ্টিগোচর হয়।

আচ্ছা, উপরে ফিবোনাচ্চি ধারাটি আরেকবার খেয়াল করুন তো। ১০ম, ১১শ এবং ১২শ পদ কত ছিল? ৫৫, ৮৯ এবং ১৪৪ না? মিলে গেল তো? অবাক হবেন না। শাহরুখ খানের “পিকচার আভি বাকি হ্যায় মেরে দোস্ত” সংলাপের কথা ম্মে আছে না? সেটা মনে করে বসে থাকুন। কারণ চমক আরো আছে 😉

কথা হল, শুধু খরগোশেই এমন? উত্তর হল, “না।” প্রকৃতিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য উদাহরণ। চলুন, জেনে নিই।

১. পাখির আকাশে ওড়া: যখন আকাশে পাখির ঝাঁক যায় সাধারণত ২১ টি পাখি একত্রে যায় ফিবোনাচ্চি ধারা অনুসরণ করে। অথবা ফিবোনাচ্চি ধারার অন্য কোন সংখ্যা মেনে ঝাঁক করে। ধরলাম ৩৪ টি পাখি একত্রে যাচ্ছিল। আপনি গুলি করে ১ টি পাখি মারলেন। এখন ওরা ৩৩ জন যাবে? একদমই না। ওরা ঝাঁক ভেঙে ২১ টি পাখি যাবে। বাকিগুলোও একইভাবে মেনে আগাবে।

২. সূর্যমুখী ফুলের পাপড়ি: একটক সূর্যমুখী ফুল নিয়ে পাপড়ি গুনে দেখুন তো! কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সব ক্ষেত্রেই ফিবোনাচ্চি ধারার কোন সংখ্যাই দেখবেন।

৩. আনারসের স্পাইরাল (Spiral): আনারসের স্পাইরাল বা চোখগুলো গুনছেন কখনো? গুনে দেখুন, ফিবোনাচ্চি ধারাই পাবেন।

৪. গাছের শাখা: গাছের শাখা গুনলেও ফিবোনাচ্চি ধারা পাওয়া যায়।

৫. মৌমাছির প্রজনন: মৌমাছির বংশবৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করলেও আমরা ফিবোনাচ্চি ধারার উপস্থিতি পাই।

৬. ফুলকপির বিন্যাস: ফুলকপির বিন্যাসের ক্ষেত্রেও ফিবোনাচ্চি ধারার খোঁজ পাওয়া যায়।

এছাড়াও প্রকৃতিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য উদাহরণ।

আগামীকাল পরবর্তী আর্টিকলে গণিতের আরো চমৎকার একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করব ইন শা আল্লাহ

Md. Ashraful Alam Shemul
Md. Ashraful Alam Shemulhttps://www.STechBD.Net
শিমুল একজন প্রযুক্তিপ্রেমী ❤️ তিনি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ধর্ম নিয়ে লেখালেখি করতে ভালোবাসেন।

সাম্প্রতিক লেখা

সম্পর্কিত লেখা